কসবা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া):
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ৫৪ বছর। অথচ এখনও কসবা উপজেলার রাউৎহাট ঋষিপাড়া বাগের বাঁশবাগানের বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হওয়া ১৪ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবর সংরক্ষণ করা হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব কবরের অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে, আর ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে বীরদের স্মৃতিচিহ্ন।
৭১-এর দুঃসময় পেরিয়ে জন্ম নেওয়া পরবর্তী প্রজন্ম জানেই না—এই বাগানেই ঘুমিয়ে আছেন ১৪ জন শহীদ! যাদের রক্তস্রোতে রচিত হয়েছে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ।
দারিদ্র্যের কারণেই সংরক্ষণ হয়নি কবর
স্থানীয় শহীদ পরিবারের সদস্যরা জানাচ্ছেন, দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত এই হিন্দু পরিবারগুলো নিজেরা কবর সংরক্ষণের আর্থিক সামর্থ্য রাখে না। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেও এখনো তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিজয় দিবস এলেই নানা প্রতিশ্রুতি শোনেন তারা, কিন্তু ডিসেম্বর পেরোতেই থেমে যায় সব উদ্যোগ।
এক শহীদ পরিবারের বৃদ্ধ সদস্যের কণ্ঠে তীব্র কষ্ট—
“বিজয় দিবসে সবাই বক্তৃতা করে, কিন্তু আমাদের শহীদ বাবাদের নামে কখনো একটি রজনীগন্ধার ডাঁটা পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।”
বিলুপ্তির পথে স্মৃতিচিহ্ন
সাবেক এক ইউপি সদস্য ব্যক্তিগত অর্থায়নে কয়েকটি কবর চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু সেগুলো এখন ভেঙে পড়েছে, মাটি ধসে গেছে, আর বৃষ্টিতে-রোদে ক্ষয়ে যাচ্ছে শহীদদের শেষ নিদর্শন। কোনটি কোন শহীদের কবর—তারও আর স্পষ্ট পরিচয় নেই।
বছরজুড়া প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়নের অপেক্ষা
স্থানীয়রা জানান, বিগত কয়েক বছরে প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ সাংবাদিক, জেলা মুক্তিযোদ্ধা অফিসের প্রতিনিধিরা সরেজমিনে এসে স্মৃতিফলক ও সংরক্ষণের আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (সাবেক) শাহরিয়ার মুক্তারও এ বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও তা আর অগ্রসর হয়নি।
বর্তমান ইউপি সদস্য রাসেল মেম্বার বলেন,
“নানা দপ্তরের লোকজন এসে দেখে গেছেন। বলেছেন স্মৃতিস্তম্ভ হবে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছরে এখানকার শহীদদের কবর উন্নয়নের স্পর্শ পায়নি।”
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বক্তব্য
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বলেন,
“আমরা জানি রাউৎহাটে ১৪ শহীদের কবর রয়েছে। কিন্তু আমাদের এখতিয়ারে কোনো সংরক্ষণ প্রকল্প নেই। সরকার প্রকল্প দিলে কাজ করা সম্ভব।”
ইউএনওর আশ্বস্তকারী মন্তব্য
কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছামিউল ইসলাম বলেন,
“সরকারিভাবে রাউৎহাট বধ্যভূমির ১৪ শহীদের কবর সংরক্ষণের বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হবে। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আমরা চেষ্টা করছি।”
শহীদ পরিবারগুলোর প্রশ্ন—৫৪ বছর পরও কি পূরণ হবে তাদের স্বপ্ন?
একটি শহীদ পরিবার বলেন—
“আমাদের বাবারা দেশকে স্বাধীন করেছেন। কিন্তু তাদের কবরই রক্ষা করা গেল না! এবার কি প্রশাসন এগিয়ে আসবে?”
দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেওয়া এই ১৪ শহীদের কবর আজ বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে। এখনই উদ্যোগ না নিলে ইতিহাস হারিয়ে যাবে, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মও জানবে না কারা রক্ত দিয়ে রক্ষা করেছেন এ মাটি।